শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৮:২৫ অপরাহ্ন

  • বাংলা বাংলা English English

রাধারানীর আবির্ভাব ও রাধাতত্ত্ব
উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধিঃ / ৩২ বার
আপডেট : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০

দ্বাপর যুগে বৃন্দাবনের রাজা বৃষভানু ছিলেন একজন পরমভক্ত। তাঁর কোন সন্তান ছিল না। একসময়ে তাঁর স্ত্রী কীর্তিদা গর্ভবতী হলেন। একদিন রাজা বৃষভানু দেখতে পেলেন যমুনার জলে একটি পদ্মফুল তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। তিনি পদ্মফুলের ভিতর একটি কন্যা সন্তান দেখতে পেয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন। বৃষভানু ও তাঁর স্ত্রী কীর্তিদা সন্তানটি পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। সেদিন ছিল ভাদ্রমাসের শুক্লাষ্টমী তিথি। মধ্যাহ্নকালে শুভক্ষণে কন্যা সন্তানটি অষ্টভূজা রূপে আবির্ভূত হলেন। বাৎসল্য রসের পুষ্টিবিধানের জন্য পরে দ্বিভূজ রূপ ধারণ করেন। বৃষভানু ও কীর্তিদা বুঝতে পারলেন সন্তানটি বিষ্ণুমায়া রাধারানী।

ব্রজের সকলেই মেয়ের রূপে মুগ্ধ হলেও তাঁর চোখ মুদ্রিত ছিল বলে সকলেই মনে করল মেয়েটি অন্ধ। তাঁর চোখ মুদ্রিত ছিল যেহেতু তিনি ভৌম বৃন্দাবনে আবির্ভূত হলে শ্রীকৃষ্ণকে না দেখা পর্যন্ত চোখ খুলবেন না বলে কৃষ্ণকে আগেই জানিয়েছিলেন।

রাজা বৃষভানু সেদিন রাধারানীর জন্মোৎসব আয়োজন করলে নন্দ মহারাজ কৃষ্ণকে নিয়ে আসেন। সকলের অগোচরে কৃষ্ণ হামাগুড়ি দিয়ে রাধারানীর কাছে যাওয়া মাত্রই রাধারানী চোখ খুলে কৃষ্ণকে দেখতে পান। রাধাকৃষ্ণের ব্রজলীলা এভাবেই শুরু।

শ্রীমতি রাধারানী হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী বা আনন্দদায়িনী শক্তির মূর্ত প্রকাশ, যিনি নিত্যকাল শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিয়োজিত। হ্লাদিনী শক্তির সার ‘ভগবৎ প্রেম’, ভগবৎ প্রেমের সার ‘ভাব’ এবং ভাবের পরম প্রকাশ হচ্ছে ‘মহাভাব’। শ্রীমতি রাধারানী হচ্ছেন মহাভাবের মূর্ত প্রকাশ এবং তাই শ্রীকৃষ্ণের আনন্দের একমাত্র উৎস।

শ্রীমতিরাধারানীর চিজ্জগতে প্রকাশ সম্বন্ধে নারদ পঞ্চরাত্রে বলা হয়েছে —

দ্বিভূজ সোহপি গোলোকে বভ্রাম রাসমন্ডলে।
গোপবেশশ্চ তরুণ জলদশ্যামসুন্দরঃ।। ২/৩/২১
এক ঈশঃ প্রথমতো দ্বিধারূপো বভুব সঃ।
একা স্ত্রী বিষ্ণুমায়া যা পুমানেকঃ স্বয়ং বিভুঃ।। ২/৩/২৪

নবমেঘের ন্যায় শ্যামসুন্দর ও গোপবেশধারী সেই দ্বিভুজ তরুণ বিভক্ত হলেন। তাঁর এক ভাগ স্ত্রী হলো, তাঁকে বিষ্ণুমায়া বলে (তিনিই রাধা) এবং অপরভাগে তিনি স্বয়ং বিভু পুরুষরূপে রইলেন। কেবল লীলা রস আস্বাদন করার জন্য দুই দেহ ধারন করেছেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে আনন্দ প্রদান করার জন্য তাঁর বাম অংশ থেকে শ্রীরাধাকে সৃষ্টি করেছেন। রাধাকৃষ্ণ ঐছে সদা একই স্বরূপ।

লীলারস আস্বাদিতে ধরে দুইরূপ।। চৈ চ আদি ৪/৯৮
রাধাদ্যাঃ পূর্ণ্যা শক্তয়ঃ – শ্রুতি প্রমাণে আদ্যাশক্তি, রাধা এবং রাধাই পূর্ণ শক্তি। আর শ্রীকৃষ্ণ পূর্ণ শক্তিমান। রাধা-কৃষ্ণই, কৃষ্ণই রাধা। তাঁদের মধ্যে কোন ভেদ নেই। কস্তুরী থেকে যেমন তার গন্ধ আলাদা করা যায় না, আগুন থেকে যেমন তার তাপকে আলাদা করা যায় না, তেমনি রাধাকৃষ্ণও কেবল লীলার নিমিত্তে দুইরূপে বিলাস করছেন—স্বরূপত তাঁরা এক।

শ্রীকৃষ্ণের লীলার পুষ্টিবিধানের জন্য রাধারানী থেকে বৃন্দাবনের গোপীগন, দ্বারকার মহিষীগন এবং বৈকুন্ঠের লক্ষীগন প্রকাশিত হয়েছেন। পদ্মপুরান, পাতালখন্ড (৫০/৫৩-৫৫) অনুসারে, শ্রীশিব নারদকে বলছেন —

দেবী কৃষ্ণময়ী প্রোক্ত্বা রাধিকা পরদেবতা।
সর্বলক্ষ্মীস্বরূপা সা কৃষ্ণাহ্লাদস্বরূপিণী।।
ততঃ সা প্রোচ্যতে বিপ্র হ্লাদিনীতি মনীষিভিঃ।
তৎকলাকোটিকোট্যংশা দুর্গাদ্যাস্ত্রিগুণাত্মিকাঃ।।
সা তু সাক্ষান্মহালক্ষ্মীঃ কৃষ্ণো নারায়ণো প্রভুঃ।
নৈতয়োর্বিদ্যতে ভেদঃ স্বল্পোহপি মুনিসত্তম।।

দেবী শ্রীরাধিকা, কৃষ্ণময়ী, পরদেবতা, সর্বলক্ষ্মীস্বরূপা,
তিনি কৃষ্ণাহ্লাদস্বরূপিণী, এজন্য মনীষীগন তাঁকে হ্লাদিনী বা আনন্দদায়িনী বলেন। ত্রিগুণময়ী দুর্গা প্রভৃতি শক্তিগন তাঁরই কলার কোটি কোটি অংশের একাংশ। শ্রীরাধাই মহালক্ষ্মী আর শ্রীকৃষ্ণ সাক্ষাৎ প্রভু নারায়ণ।

হে মুনিসত্তম এঁদের মধ্যে কোন ভেদ নাই। অর্থাৎ, শ্রীমতি রাধারানী যে শ্রীকৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য হ্লাদিনী শক্তি এ ব্যাপারে কোন সংশয় নেই। তাঁরা পরস্পর নিত্যসঙ্গী। গোলক বৃন্দাবন ধামে তাঁরা নিত্য লীলা বিলাস করছেন।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানীর সমস্ত লীলা হচ্ছে প্রেমময়। এ জগতে প্রেমের লেশমাত্র গন্ধ নেই। এটি কামময় জগত। কাম ও প্রেমের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ। নিজের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির বাসনা হলো কাম, আর পরমেশ্বর ভগবানের ইন্দ্রিয়ের প্রীতি সাধনের ইচ্ছাকে বলে প্রেম।

আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি বান্ছা হলো কাম
কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম।

রাধা-কৃষ্ণের প্রণয় ভগবানের হ্লাদিনী শক্তির বিকার। শ্রীমতী রাধারানী ও শ্রীকৃষ্ণ একাত্মা হলেও তাঁরা অনাদিকাল থেকে গোলোকে পৃথক পৃথক দেহ ধারন করে আছেন। এভাবে তাঁরা পরস্পরের প্রেমরস আস্বাদন করেন।

সেই চিন্ময় দেহধারী রাধাকৃষ্ণ গোলক থেকে দ্বাপর যুগে আবির্ভূত হয়ে বৃন্দাবনে বিভিন্ন লীলার মাধ্যমে লীলা রস আস্বাদন করেন। গোপালতাপনী শ্রুতি হতে জানা যায় যে, শ্রীরাধা হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠা, সর্বোত্তমা প্রেয়সী।

তস্য আদ্যা প্রকৃতি রাধিকা নিত্যা নির্গুণা।
যস্য অংশে লক্ষী দুর্গাদিকা শক্তয়॥

“তাঁর (শ্রীকৃষ্ণের) আদ্যাশক্তি রাধিকা হচ্ছেন নিত্যা, নির্গুণা, লক্ষী, দুর্গা ইত্যাদিসহ ভগবানের শক্তিরাজি তাঁর (রাধিকার) অংশ স্বরূপ”।

এভাবে গোপালতাপনী শ্রুতিতে রাধাকে আদ্যাশক্তি, ভগবানের মূল শক্তিরূপে বর্ননা করা হয়েছে।
ঋক-পরিশিষ্টে উল্লেখ আছে —

রাধয়া মাধবো দেবো মাধবো নৈব রাধিকা বিভ্রাজন্মে জনেস্বেতি।

”রাধা মাধবের দ্বারা বিভাসিত এবং মাধব রাধা দ্বারা বিভাসিত হয়েছেন। এভাবে পরস্পর দ্যুতিমান হয়ে তাঁরা লোকমধ্যে বিরাজ করছেন “।

বৃহৎ গৌতমীয় তন্ত্রে বলা হয়েছে —

সত্ত্বং তত্ত্বং পরত্বং চ তত্ত্বত্রয়ং অহং কিল।
ত্রিতত্ত্বরূপিনী সাপি রাধিকা নম বল্লভা॥

“আমি যদিও নিত্যানন্দময়, তবুও আমি ত্রিতত্ত্বস্বরূপ, এই সৃষ্টির কার্য ও কারণ উভয়ই এবং উভয়ের অতীত। তেমনই, যদিও রাধা নিত্যানন্দময়, দিব্যানন্দের মূর্ত বিগ্রহ, তবুও তিনি ত্রিতত্ত্বস্বরূপা, সৃষ্টির কার্য ও কারণ এবং উভয়ের অতীত”।

এর অর্থ হচ্ছে, ঠিক যেমন কৃষ্ণ সর্ব কারণের কারণ এবং সব কিছুর অতীত, তেমনি রাধা পরা শক্তি হওয়া

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ক্যাটাগরির আরো সংবাদ