বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১০:০৬ পূর্বাহ্ন

  • বাংলা বাংলা English English

ক্রসফায়ারে নিহতদের ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে প্রচার করে প্রদীপ নিজে কৃতিত্ব নিতেন
স্টাফ রিপোর্টার খোরশেদ আলম / ১৬ বার
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০

ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ জন্য আলোচিত কক্সবাজারের টেকনাফ থানা। মাত্র ২২ মাসে ওই থানা পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে ১৭৪ জন। পুরো সময়টাতেই টেকনাফ থানার অফিসার্স ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন প্রদীপ কুমার দাশ। ক্রসফায়ারের বেশির ভাগই ঘটেছে মেরিন ড্রাইভ এলাকায়।

স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি ‘ডেথজোন’ হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ উঠেছে, ওসি প্রদীপের নির্দেশে কথিত ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়েছে তাদের। এরমধ্যে একই বাড়ির ৪ জন, একই পরিবারের ২ জনও আছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চাহিদা মতো টাকা না পেলে ক্রসফায়ার দেয়ার নির্দেশ দিতেন ওসি। এমনকি নিজেও সরাসরি অংশ নিতেন কথিত বন্দুকযুদ্ধের প্রক্রিয়ায়।

আর এসব ক্রসফায়ারে নিহতদের ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে প্রচার করে প্রদীপ নিজে কৃতিত্ব নিতেন। তবে টেকনাফের মানুষজন এখন বলছেন, তিনি মূলত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষার জন্য এসব ক্রসফায়ার দিতেন। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ছিল তার ঘনিষ্ঠতা। ইয়াবা ব্যবসায়ী সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদির সঙ্গেও ছিল তার দারুণ সখ্য।

বদির সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের বিভিন্ন ছবি ঘুরছে সামাজিক মাধ্যমে। ওসি প্রদীপের অপকর্ম নিয়ে টেকনাফবাসী এতোদিন মুখ না খুললেও, এখন একের পর এক তার অপকর্ম বেরিয়ে আসছে। ঈদের আগের দিন মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে হত্যার পর একের পর এক বের হতে থাকে তার কথিত ক্রসফায়ারের নেপথ্যের গল্প। এ যেন প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো অবস্থা। অভিযোগ রয়েছে, ইয়াবা কারবারিদের মধ্যে নিয়মিত মাসোহারা না দিলেই চলতো ক্রসফায়ার। যখন তখন সাজানো হতো ক্রসফায়ারের গল্প।

এলাকাবাসী জানান, টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীর নেতৃত্বে এলাকাটি ‘ক্রসফায়ার জোন’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, ওসি প্রকাশ্যে মাদক কারবারিদের নির্মূল করার ঘোষণা দিলেও তার এই মিশনে শীর্ষ কারবারি হাজী সাইফুল ছাড়া উল্লেখযোগ্য কেউ মুখোমুখি হয়নি। বন্দুকযুদ্ধের নামে নিহতদের বেশির ভাগই ইয়াবার খুচরা বিক্রেতা। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আত্মসমর্পণের নামে শীর্ষ কারবারিদের রেহাইয়ের সুযোগ দিয়ে এবং চুনোপুঁটিদের দমন করে চলছে ক্রসফায়ার বাণিজ্য। পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য মতে, ২০১৮ সালের মে মাস থেকে গত ৩০শে জুলাই পর্যন্ত শুধু কক্সবাজারে পুলিশ, বিজিবি ও র?্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ২৮৭ জন নিহত হয়।

এ সময় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ১৭৪ জন, বিজিবি’র সঙ্গে ৬২ জন এবং র?্যাবের সঙ্গে ৫১ জন। শুধু টেকনাফেই পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে ১৬১ জন। কিন্তু ইয়াবা চোরাচালান থেমে নেই। শুধু তাই নয়, এসব ক্রসফায়ার দিয়ে একাধিকবার অর্জন করেছেন পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদক। কথিত এই ক্রসফায়ারের জন্য ২০১৯ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ বা বিপিএম পেয়েছিলেন প্রদীপ।

পদক পাওয়ার জন্য তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে ছয়টি কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন। সবক’টিতেই ক্রসফায়ারের ঘটনা ছিল। প্রদীপ কুমার দাশ প্রায় ২৫ বছরের চাকরিজীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলে। জানা গেছে, বিভিন্ন জায়গায় ওসির বিভিন্ন রকম সোর্স রয়েছে। যাদের কাজ হচ্ছে নিরীহ মানুষদের টার্গেট করা। পরে টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের ফোন করে টাকা দাবি করতেন। টাকা দিতে না পারলে মাদক কারবারি আখ্যা দিয়ে মামলা দেয়া হতো। বাড়াবাড়ি করলে ‘ক্রসফায়ারে’ দিয়ে দিতেন। এলাকাবাসী বলছেন, প্রতিটি ক্রসফায়ারের ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত করলে আসল রহস্য বের হয়ে আসবে।

২০১৮ সালের ২৮শে অক্টোবর অভিযানে নিহত হন নাজিরপাড়ার কামাল হোসেন। কামালের মা নূরুন্নাহার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গরুর ব্যবসা করে কোনোরকম সংসার চালাতো কামাল। তার নিজের কোনো ঘরও নেই। অভিযানের সময় কৌতূহলে এগিয়ে গেলে পুলিশ কামালকে আটক করে। পরে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার খবর পাই।’ তিনি দাবি করে বলেন, পুলিশের এক সদস্য ১০ লাখ টাকা চেয়েছিলেন। দিতে পারেননি তারা।

আরেকটি ঘটনা চলতি বছরের ২২শে জুলাইয়ের। শেষ রাতে উখিয়ার কুতুপালং গ্রামের বাসিন্দা ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহমেদের বাড়িতে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আক্তারের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। পরিবারের সদস্যরা যখন ঘুমাচ্ছিলেন ঠিক তখন পুলিশের চিৎকারে ঘুম ভাঙে তাদের। অভিযানে বখতিয়ার মেম্বারকে তার বাড়ির শয়নকক্ষ থেকে উঠিয়ে নেয়ার সময় পরিবারের সদস্যরা বাধা দেন। কিন্তু ‘তার সঙ্গে একটু কথা আছে’ বলে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।

পরদিন দুপুরে বখতিয়ারকে ছেড়ে দেয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন। পরে ওইদিন রাতেই ফের বখতিয়ারের বাড়িতে যান ওসি প্রদীপ ও মর্জিনা। পরিবারের সদস্যদের মারধর করে বাড়ির আলমারি থেকে ব্যবসার ৫০ লাখ টাকা, ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও জমির কাগজপত্র নিয়ে যান এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। এমনকি সেদিন পরিবারটির নারী সদস্যদেরও মারধর করে পুলিশ। আর ২৩শে জুলাই রাতেই পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন বখতিয়ার মেম্বার। এরপর উল্টো তার তিন সন্তানের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে মামলা ঠুকে দেয় পুলিশ।

বখতিয়ার মেম্বারের স্ত্রী শাহিনা আখতার বলেন, বখতিয়ার মেম্বারের ইয়াবা কিংবা মাদক মামলা তো দূরের কথা, অন্য কোনো মামলাই নেই। অথচ ওসি প্রদীপ কুমার তার স্বামীকে তুলে নিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ সাজিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেন, কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়াই একজন মানুষকে কীভাবে হত্যা করা যায়?

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ক্যাটাগরির আরো সংবাদ