সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১২:৫২ অপরাহ্ন

  • বাংলা বাংলা English English

মানিকগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা অনুষ্ঠিত!!
মোঃ একদিল হোসেন বার্তা সম্পাদকঃ সন্ধান বাংলা টিভি। / ৭০ বার
আপডেট : সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০

দক্ষিণ এশিয়ার একটি খেলা লাঠি খেলা বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যগত মার্শাল আর্ট। লাঠি খেলা’ অনুশীলনকারীকে ‘লাঠিয়াল’ বলা হয়।ছাড়াও, লাঠি চালনায় দক্ষ কিংবা লাঠি দ্বারা মারামারি করতে পটু কিংবা লাঠি চালনা দ্বারা যারা জীবিকা অর্জন করে, তিনি/তারা লেঠেল বা লাঠিয়াল নামে পরিচিতি পান। ব্যুত্পত্তি লাঠি একটি প্রাকৃত শব্দ যেটি সংস্কৃত ফর্ম ইয়াস্টি থেকে এসেছে। সুতরাং, লাঠি খেলাকে লাঠির কৌশল বলা যেতে পারে। দক্ষিণ এশীয় ভাষায় বাংলাসহ হিতোপদেশ আছে যে যার আছে লাঠি তার আছে ক্ষমতা। লাঠি খেলায় যে দক্ষ বা লাঠি খেলা নিয়ে যাদের ​​বসবাস তারাও লাঠিয়াল হিসাবে পরিচিত।
যন্ত্রপাতি লাঠি মুগুর, গদা বা ডাণ্ডা বিশেষ যেটি সাধারণত শক্ত বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় এবং কখনও কখনও একটি লোহার রিংয়ের সঙ্গে আবদ্ধ অবস্থায় দুর্দান্ত অস্ত্রে পরিণত হয়। ইতিহাস লাঠি খেলা লাঠি দিয়ে আত্মরক্ষা শেখায়। ব্রিটিশ শাসনামলে অবিভক্ত বাংলার জমিদাররা (পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বঙ্গ) নিরাপত্তার জন্য লাঠিয়ালদের নিযুক্ত করত। চরাঞ্চলে জমি দখলের জন্য মানুষ এখনও লাঠি দিয়ে মারামারি করে। মহরম ও পূজাসহ বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানে এই খেলাটি তাদের পরাক্রম ও সাহস প্রদর্শনের জন্য খেলা হয়ে থাকে। এই খেলার জন্য ব্যবহৃত লাঠি সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা, এবং প্রায়ই তৈলাক্ত হয়। অত্যাশ্চর্য কৌশলের সঙ্গে প্রত্যেক খেলোয়াড় তাদের নিজ নিজ লাঠি দিয়ে রণকৌশল প্রদর্শন করে। শুধুমাত্র বলিষ্ঠ যুবকেরাই এই খেলায় অংশ নিতে পারে। কিন্তু বর্তমানে শিশু থেকে শুরু করে যুবক, বৃদ্ধ সব বয়সের পুরুষেরাই লাঠিখেলায় অংশ নিয়ে থাকেন। উত্তরবঙ্গে, ঈদের সময়ে চাদি নামক একটি অনুরূপ খেলা খেলা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ অংশে পূজাসহ বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানের সময় “লাঠি খেলা” এর প্রদর্শনী এখনও আছে। পুরু বাংলায় গুরুসাদে দত্ত কর্তৃক ব্রাতাশ্রী আন্দোলনের সময়ও লাঠি খেলা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
গ্রামের বিভিন্ন বয়সের নারী, পুরুষ ও শিশু, কিশোর ছুটে এসে জমায়েত হতে থাকেন লাঠি খেলার জন্য নির্ধারিত স্থানে। এই অবসরে লাঠিয়ালগণ আয়োজকদের দেওয়া খানা-খাদ্য গ্রহণ করেন এবং খাদ্য গ্রহণের পর নির্ধারিত স্থানে মুখোমুখি হয়ে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে মূল লাঠি খেলা শুরুর ডাক ভাঙেন। এ সময় তারা ডাক ভাঙতে যে সব ধ্বনি ও বাক্য ব্যবহার করেন, তা হচ্ছে-“ও ও ও/তুমি যে কেমন বীর/তা জানবো আমি রে/ও ও ও।” এমন ভাষায় ডাক ভেঙে সকলে মিলে এক সঙ্গে মাটি ছুঁয়ে প্রণাম করে সাজ-পোশাক পরার জন্য একটি ঘরে ঢোকেন। এ সময় উঠানে পাটি বিছিয়ে একদল বাদ্যকার ঢোল, করতাল ও কাসার ঘড়া বা কলস বাজাতে শুরু করেন। এই সকল বাদ্য বাদনের মাঝখানে লাঠিয়ালগণ সাজ-পোশাকের মধ্যে বিভিন্ন রঙের হাতা-ওয়ালা ও স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে, সাদা রঙের ধুতি বা বর্ণিল ঘাঘরার মতো এক ধরনের বস্ত্র পরে, পায়ে ঘুঙুর বেঁধে, খালি পায়ে বিভিন্ন রঙের লাঠি হাতে খেলার মাঠে নেমে পড়েন। শুরুতে তারা সারি বেধে একটি বৃত্ত রচনা করে খেলার মাঠ প্রদক্ষিণ করেন। মাঠ প্রদক্ষিণ শেষে লাঠিয়ালরা একে একে তাদের হাতের লাঠি খেলার মাঠের কেন্দ্রবিন্দুর মাটিতে রেখে প্রণাম করেন এবং সে লাঠিকে পরক্ষণেই হাতে তুলে নিয়ে বাদ্যযন্ত্র ও বাদ্যযন্ত্রীদের প্রণাম করেন এবং খেলা শুরুর আগে আবার তারা উচ্চস্বরে ডাক ভাঙেন। তারপর বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে দেহে, পায়ে ও হাতে ছন্দ তুলে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে নৃত্য পরিবেশন করেন, যা অনেকটা দৈহিক কসরতমূলক নৃত্য। লাঠি খেলার মূল আসর শুরুর আগেই এই নৃত্য বেশ আকর্ষণীয়। এক এক এলাকার লাঠি খেলার এই নৃত্যভঙ্গিতে যেমন বেশ বৈচিত্র চোখে পড়ে- তেমনি একই এলাকায় প্রচলিত লাঠি খেলার নৃত্যভঙ্গিতেও কিছু বৈচিত্র চোখে পড়ে বৈকি।
লাঠি খেলার আসরে লাঠিয়ালদের নৃত্যাংশ শেষ হলে তারা পরস্পর কিছু সংক্ষিপ্ত ও কৌতুককর সংলাপে অংশ নেন। এরপর শুরু হয় লাঠি খেলার মূল পর্ব, যাকে আক্রমণাক্ত লাঠি খেলা বলা যেতে পারে। এ পর্বের শুরুতেই লাঠিয়ালরা সমান সদস্যে দুই দলে বিভক্ত হয়ে লাঠি খেলেন। এক্ষেত্রে বাদ্যের তালে তালে একদল আরেকদলকে লাঠির মাধ্যমে আক্রমণ করতে গিয়ে মুখে বলতে থাকেন-‘খবরদার’, প্রতিপক্ষের লাঠিয়ালরা একই ভাবে সে দলকে প্রতি আক্রমণ করতে গিয়েও বলেন-‘খবরদার’। এ ধরনের লাঠি খেলার একটি প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে খেলার মাঝে কোনো লাঠিয়ালের গায়ে লাঠির আঘাত লাগলে খেলা তাৎক্ষণিকভাবে থেমে যায়, থেমে যায় বাদ্য বাদন। আসলে, লাঠি খেলায় একপক্ষ তার প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে চাইবে ঠিকই কিন্তু অন্যপক্ষকে তা লাঠি দিয়েই ঠেকাতে হয়, না-ঠেকাতে পারলে সে খেলার নিয়ম অনুযায়ী আপনাতেই পরাস্থ হয়ে যায়। তাই লাঠি খেলতে খেলতে কোনো লাঠিয়ালের গায়ে লাঠির আঘাত লাগলে তা খেলা বন্ধ করে দর্শককে জানানোরও একটা রীতি এই খেলায় এভাবে বর্তমান রয়েছে। আবহমানকাল ধরে বিভিন্ন জেলায় বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে লাঠিখেলা। কিন্তু কালের আর্বতনে মানুষ ভুলতে বসেছে এ খেলা। এ খেলা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত। শারীরিক কসরত প্রদর্শন ও নিজেদের আত্মরক্ষার্থে বহুকাল থেকে এ লাঠি খেলার প্রচলন। একজন ওস্তাদের নির্দেশে কখনো একক ভাবে কখনো দুই দলে ভাগ হয়ে আবার কখনো সবাই একত্রে এই লাঠি খেলা দেখানো হয়। বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে দীর্ঘদিন থেকে এ খেলা চলে এলেও বর্তমানে তা বিলুপ্তির পথে। বিভিন্ন জায়গায় মাঝে মাঝে এ লাঠি খেলা দেখা গেলেও তা ক্ষনিকের জন্য। খেলাটি দিন দিন হারিয়ে যাওয়ার ফলে এর খেলোয়াড় সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে না নুতন খেলোয়াড়। আর পুরনো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা অর্থাভাবে প্রসার করতে পারছেন না এ খেলা। ফলে দিনে দিনে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। তাই নির্মল বিনোদনের খোরাক আর গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এ লাঠি খেলাটি আর সচরাচর চোখে পড়ে না।
শারীরিক কসরতের এ খেলাটি একটি অন্যতম ব্যায়াম। এর মাধ্যমে শরীর ও মন সতেজ থাকে এবং বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম বটে। তাই অবিলম্বে সরকারি-বেসরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে হারিয়ে যাওয়া গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য লাঠি খেলাকে পুনরোউজ্জীবিত করা উচিত।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ক্যাটাগরির আরো সংবাদ